আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চড়া, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবার (১৮ মে) বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক ও শেয়ার বাজারেও নতুন করে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা: রোববার (১৭ মে) সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় কেন্দ্রটির জেনারেটরে আগুন লেগে যাওয়ার পর থেকেই বিশ্ব তেলের বাজারে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাবে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় বেশ খানিকটা বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১.২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০.৬৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬.৪২ ডলারে পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালি সংকট ও মন্দার পূর্বাভাস: তেলের বাজারে এই আগুন লাগার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশের নিয়ন্ত্রক ‘হরমুজ প্রণালি’ ঘিরে চলমান উত্তেজনা। অভিযোগ উঠেছে, তেহরান এই নৌপথের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করায় সেখানে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাপিটাল ইকোনমিকস’-এর বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে আগামী জুনের শেষ নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তারা আরও সতর্ক করেছেন যে, এই অচলাবস্থা বছরের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকলে এবং ২০২৭ সাল নাগাদ তেলের দাম ১৫০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করলে, যুক্তরাজ্য ও ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশে ঠেকতে পারে। এর ফলে সুদের হার বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর মন্দার মুখে পড়বে।
বন্ড ও শেয়ার বাজারে ধস: জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা লেগেছে বৈশ্বিক বন্ড ও শেয়ার বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর ও ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৪.৫৮৪ শতাংশ এবং ৫.১০৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতেও বড় পতন লক্ষ করা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে ২.১ শতাংশ এবং জাপানের নিক্কেই সূচক কমেছে ০.৪ শতাংশ। জাপানের বাইরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমএসসিআই সূচকও ০.৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের ফিউচার সূচকেও দিনের শুরুতেই পতন দেখা গেছে। তবে এই মন্দাভাবের মধ্যেও চীনের শেয়ারবাজার চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে; দেশটির বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে অভ্যন্তরীণ খুচরা বিক্রি ও শিল্প উৎপাদনের ডেটা প্রকাশের অপেক্ষায় আছেন।
জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর জরুরি বৈঠক: এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই আজ সোমবার ফ্রান্সের প্যারিসে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা এক জরুরি বৈঠকে বসছেন। বৈঠকে মূলত হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং বিশ্বব্যাপী জরুরি কাঁচামালের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার বিষয়ে আলোচনা হবে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এই জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: জিও নিউজ





































